এনডিটিভি জানিয়েছে, শনিবার সকালে প্রকাশিত ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেন্স (এনআরসি) বা নাগরিকপঞ্জিতে আসামে বসবাসত ১৯ লাখের নাম নেই।

অর্থাৎ নাগরিকত্বের তালিকা থেকে এই ১৯ লাখ বাদ পড়লেন; যার একটি বড় অংশ মুসলিম বলে মনে করা হচ্ছে।

সকাল ১০টায় অনলাইনে চূড়ান্ত নাগরিকপঞ্জিতে প্রকাশিত হয়। যাদের ইন্টারনেট সংযোগ নেই, তারা সরকার পরিচালিত সেবাকেন্দ্রে গিয়ে নিজেদের অবস্থা দেখতে পারছেন বলে আনন্দবাজার জানিয়েছে।




তালিকায় নাম না থাকলেই নাগরিকত্ব বাতিল কিংবা বন্দিশিবিরে নেওয়া হবে না বলে ইতোমধ্যে জানিয়েছে আসাম রাজ্য সরকার।

তালিকায় যাদের নাম নেই, তাদের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে বলা হয়েছে ১২০ দিনের মধ্যে। এই বিষয়ে শুনানির জন্য রাজ্যজুড়ে ১ হাজার ট্রাইব্যুনাল গড়ে তোলা হবে বলে জানানো হয়েছে।

ইতোমধ্যেই ১০০ ট্রাইব্যুনাল খোলা হয়েছে। আরও ২০০টি ট্রাইব্যুনাল সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই খোলার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।




ট্রাইব্যুনালে মামলায় হেরে গেলে হাই কোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার সুযোগও রয়েছে।

বৈধ নাগরিকদের চিহ্নিত করা এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বাতিল করার লক্ষ্যে নতুন করে এই নাগরিকপঞ্জি প্রকাশিত হল।
“নাগরিকপঞ্জিতে নিজের অবস্থা জানতে সেবা কেন্দ্রে ভিড়ের ছবিটি আনন্দবাজারের সৌজন্যে”
নাগরিকপঞ্জিতে নিজের অবস্থা জানতে সেবা কেন্দ্রে ভিড়ের ছবিটি আনন্দবাজারের সৌজন্যে




তালিকা প্রকাশের পর বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতে পারে এমন আশঙ্কা করেই গোটা আসামকে নিরাপত্তার বলয়ে মুড়ে ফেলা হয়েছে। রাজ্য জুড়ে ৬০ হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আরও ২ হাজার আধাসেনা পাঠিয়েছে কেন্দ্র।

প্রতিবেশী বাংলাদেশে থেকে বহু মানুষ অবৈধভাবে আসামে বসবাস করছে দাবি তুলে কয়েক দশক আগে আসামে ‘বাঙ্গালি খেদাও’ আন্দোলন শুরু হয়।

অবৈধ বাংলাদেশিদের চিহ্নিত করে তাদের ফেরত পাঠানোর লক্ষ্যেই চার বছর আগে আসাম সরকার নতুন নাগরিকপঞ্জি তৈরির কাজ শুরু করে।

নাগরিকপঞ্জিতে ঠাঁই পেতে হলে বাসিন্দাদের প্রমাণ করতে হয়, তারা ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে রাজ্যে আবাস গেড়েছেন।

গত চার বছর ধরে সেখানকার বাসিন্দাদের নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণের নানা কাগজ-পত্র হাতে এক দরজা থেকে অন্য দরজায় ছুটতে হয়েছে।




২০১৮ সালের জানুয়ারিতে প্রথম খসড়া নাগরিকপঞ্জি প্রকাশ করা হয়। সেখানে মাত্র এক কোটি ৮০ লাখ মানুষের ঠাঁই হয়। অথচ আবেদন করেছিল তিন কোটি ২৯ লাখ মানুষ।

তা নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও বিক্ষোভ শুরু হলে ওই বছর জুলাই মাসে সংশোধিত খসড়া নাগরিকপঞ্জি প্রকাশ পায়। নতুন তালিকায় দুই কোটি ৮৯ লাখ মানুষের নাম ঠাঁই পেলেও বাদ পড়েন উত্তর-পূর্ব আসামের প্রায় ৪০ লাখ বাসিন্দা।
এবারের নাগরিকপঞ্জিতে বাদ পড়াদের সংখ্যা কমে ১৯ লাখে এল।

আসামের নাগরিকপঞ্জি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়: জয়শঙ্কর
আসামের নাগরিকপঞ্জি নিয়ে বাংলাদেশে উদ্বেগের মধ্যেই বিষয়টিকে ‘ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।

আসামে সংশোধিত নাগরিকপঞ্জিতে নাম নেই ৪০ লাখ মানুষের





তবে জম্মু ও কশ্মীরের সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করার পর থেকে চলমান উত্তেজনা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিন মাস আগে নরেন্দ্র মোদীর নতুন সরকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রথমবার বাংলাদেশ সফরে আসা জয়শঙ্কর মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেনের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তারা।

মোমেন বলেন, তাদের মধ্যে ‘খুবই ভালো’ আলোচনা হয়েছে। বেশ কিছু বিষয়ে তারা ‘কম-বেশি ঐকমত্যে’ পৌঁছেছেন। তবে কোন কোন বিষয়ে এই ঐকমত্য হয়েছে- তা তিনি বিশদ।




বাংলাদেশ ও ভারতের কর্মকর্তাদের ভাষায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের সম্পর্ক রয়েছে ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো অবস্থায়। এই বন্ধুত্বকে আরও এগিয়ে নেওয়ার কথা নিয়মিতই বলা হচ্ছে দুই সরকারের তরফ থেকে।

গত এক দশকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে শতাধিক চুক্তি হয়েছে, যার মধ্যে ৮৬টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে কেবল গত তিন বছরের মধ্যে। সমুদ্রসীমা ও ছিটমহল নিয়ে বহুদিনের ঝুলে থাকা সমস্যাও এই সময়ে মিটিয়ে ফেলেছে বাংলাদেশ ও ভারত সরকার।




কিন্তু তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুত চুক্তিটি এখনও আটকে আছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের বিরোধিতার কারণে। দুই দেশের বিভিন্ন বৈঠকে নিয়মিতভাবে এ বিষয়টি আসছে, কিন্তু তিস্তার জট খুলছে না।

তাছাড়া সীমান্ত লাগোয়া ভারতীয় রাজ্য আসামের নাগরিকপঞ্জি (ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেন্স-এনআরসি) নিয়েও বাংলাদেশে উদ্বেগ রয়েছে।

যেভাবে ওই তালিকা করা হচ্ছে তাতে আসামের ৪০ লাখের বেশি বাসিন্দা নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে এবং তাদের অবৈধ ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করে ভারত থেকে বের করে দেওয়া হতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে দেশটির গণমাধ্যমে।




কিন্তু সাংবাদিকদের ব্রিফ করতে এসে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো আলোচনায় যাননি জয়শঙ্কর।

তিনি সরাসরিই বলেন, “এটা একান্তই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়।”

তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের জন্য পনি খুবই ‘গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়’।

“অভিন্ন ৫৪টি নদীর পানিবণ্টনের বিষয়ে একটি ফর্মুলা আমরা বের করতে চাইছি যাতে দুই দেশই লাভবান হতে পারে।”

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ওই চুক্তিতে রাজি থাকালেও এর আগে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের বিরোধিতায় তা স্বাক্ষরিত না হওয়ার ঘটনার দিকে ইংগিত করে জয়শঙ্কর বলেন, “এ বিষয়ে আমাদের মনোভাব আপনারা জানেন। এ বিষয়ে আমাদের একটা প্রতিশ্রুতি আছে, আর সেটা এখনও বদলায়নি।”




এক সময় ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের দায়িত্ব সামলে আসা জয়শঙ্কর বলেন, আসছে অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফর নিয়ে আলোচনা করাও তার ঢাকা সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষায়, দুই দেশের সম্পর্ক এখন কৌশলগত অংশীদারিত্বের চেয়েও বেশি কিছু। আর আগে পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে এবং এখন পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারাটাও তার জন্য বিশেষ কিছু।

“আমরা বিশ্বাস করি, নিরাপত্তার প্রশ্নে, বিশেষ করে অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ এবং উগ্রবাদের বিরুদ্ধে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করতে পারলে দুই দেশের মানুষই উপকৃত হবে।”

জয়শঙ্কর বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সব দিক দিয়েই দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বেড়েছে। ভারত এই অংশীদারিত্বকে আরও এগিযে নিতে চায়।

তার ভাষায়, জ্বালানি ক্ষেত্রে সহযোগিতার মধ্য দিয়েও দুই দেশের লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। আর দ্বিপক্ষী বাণিজ্যটাও এমনভাবে বাড়াতে হবে, যাতে তা বাংলাদেশের জন্য ‘স্বস্তিদায়ক’ হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উদযাপনে ভারতের অংশীদার হওয়ার আগ্রহের কথা আবারও তুলে ধরে জয়শঙ্কর।

তিনি বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেনের সঙ্গে বৈঠকে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের যাতে দ্রুত নিরাপদে মিয়ানমারে তাদের দেশে ফেরত পাঠানো যায়, এবং প্রত্যাবাসন যেন টেকসই হয়, সে বিষয়ে দুই পক্ষই বৈঠকে একমত হয়েছে।

“বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের যে সম্পর্ক, সব প্রতিবেশী দেশের জন্যই তা উদাহরণ হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী চান, এই অংশীদারিত্ব দক্ষিণ এশিয়ায় একটি রোল মডেল হয়ে থাকুক।

সোমবার রাতে ঢাকায় আসার পর মঙ্গলবার সকালে ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বিকালে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন।

সফর শেষে বুধবার সকালে ঢাকা ছাড়ার কথা রয়েছে জয়শঙ্করের।