ভারত-শাসিত জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের এক মাস পূর্তি হলো বৃহস্পতিবার। এই এক মাসের বিভিন্ন ঘটনার অন্তত একটির পরিসংখ্যান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য মোটেই সুখকর নয়। কারণ, যে প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রীর হৃদয়ের অত্যন্ত কাছাকাছি, তাঁর নিজের কথায় যা ভারতের ‘গেম চেঞ্জার’, উপত্যকায় অনির্দিষ্ট অবরোধের দরুন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সেই প্রকল্পই। দেশের গ্রাম-শহরের গরিব মানুষের কল্যাণে এক বছর আগে ওই প্রকল্প চালু করেছিলেন নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং।




‘আয়ুষ্মান ভারত’-এর অধীন সেই প্রকল্পের নাম ‘প্রধানমন্ত্রী জন-আরোগ্য যোজনা’। গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী এই প্রকল্প চালু করেছিলেন। অর্থাৎ, এই মাসে ওই প্রকল্পের বর্ষপূর্তি হতে চলছে। প্রকল্পের অধীনে সারা দেশের ১০ লাখ ৭৪ হাজার দরিদ্র পরিবারের ৫০ কোটি মানুষের উপকৃত হওয়ার কথা। এই প্রকল্প অনুযায়ী, চিহ্নিত দরিদ্র পরিবারের সদস্যদের বছরে ৫ লাখ টাকার সমতুল্য চিকিৎসা পরিষেবা বিনা মূল্যে পাওয়ার কথা। সে জন্য দেশের বিভিন্ন রাজ্যে চিহ্নিত হয়েছে একাধিক হাসপাতাল। সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্যদের এই বিমার আওতায় সব ধরনের অসুখের উন্নত মানের চিকিৎসা পাওয়ার কথা।




গত ৫ আগস্ট জম্মু-কাশ্মীরের বিভাজন ও তার বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করার আগে এই যোজনা সবচেয়ে বেশি সফল ছিল কাশ্মীর উপত্যকায়। ভারতের ‘ন্যাশনাল হেলথ অথোরিটি’ বা এনএইচএর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন মাসে জম্মু-কাশ্মীরের হাসপাতালগুলোয় এই যোজনার অধীনে ভর্তি হয়েছিলেন ২ হাজার ৫০ জন রোগী। জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ৪৫২। পরবর্তী এক মাসে সেই সংখ্যা বেড়ে হয় ১ হাজার ৬৮৮। উত্তরোত্তর এই সংখ্যা বৃদ্ধি ৫ আগস্টের পর মাত্রাতিরিক্ত কমে যায়। ৩৭০ ধারা বিলোপের পর প্রথম তিন সপ্তাহে এই যোজনায় রোগী ভর্তির সংখ্যা কমে হয়েছে যথাক্রমে ১৭৯,১৬৩ ও ২৫০। ঝুপ ঝুপ করে এই সংখ্যা হ্রাসের কারণ একটাই। জম্মু-কাশ্মীরজুড়ে অবরোধ ও ইন্টারনেট পরিষেবা বাতিল।




এনএইচএর প্রধান ইন্দু ভূষণের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই যোজনা পুরোপুরি ‘অনলাইন’নির্ভর। অনলাইন মারফত যাবতীয় তথ্য জমা দিতে হয়। এক মাস ধরে প্রধানত উপত্যকায় অনলাইন পরিষেবা বন্ধ থাকায় দরিদ্র মানুষ এই বিমা প্রকল্পের অধীনে চিকিৎসা পরিষেবা পাচ্ছে না। অবস্থা সামাল দিতে তাই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আগে চিকিৎসা করতে হবে। রোগীর তথ্য আপলোড করার জন্য বাড়তি তিন সপ্তাহ সময় দেওয়া হবে।




এই প্রকল্পে জম্মু-কাশ্মীর যোগ দেয় গত ডিসেম্বরে। কিন্তু পরিষেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে শিগগিরই তৎকালীন রাজ্যটি শীর্ষে চলে আসে। এই কয় মাসের মধ্যে জম্মু-কাশ্মীরে এই যোজনার মোট ১১ লাখ ৩৩ হাজার ৬৯৪টি হেলথ কার্ড দেওয়া হয়েছে।




দিন কয়েক আগে নিরাপত্তারক্ষীদের ছোড়া পেলেটের আঘাতে আহত এক স্কুলছাত্রের হাসপাতালে মৃত্যুর অভিযোগ পরিস্থিতিকে ফের জটিল করে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সাধের বিমা প্রকল্প যে এলাকাকে (জম্মু-কাশ্মীর) সবচেয়ে বেশি উপকৃত করেছিল, বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের ফলে এখন সেই এলাকাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। দুর্দশা ও হতাশাগ্রস্ত সেখানকার দরিদ্র অধিবাসীরাই।




উপত্যকায় ইন্টারনেট পরিষেবা পুরোপুরি চালু কবে হবে, সে বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছেও কোনো স্বচ্ছ ধারণা নেই। কোনো কোনো এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে টু-জি পরিষেবা চালু করলেও তা বহাল রাখা হচ্ছে না। এক-একটি হিংসাত্মক ঘটনায় পরিস্থিতি ফের অস্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। দিন কয়েকের মধ্যে উপত্যকায় পালিত হওয়ার কথা মহররম। কিন্তু মহররমের তাজিয়া মিছিল বের করতে দেওয়া হবে কি না, হলেও কোন কোন এলাকা দিয়ে তা যাবে, প্রশাসন এখনো সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।