প্রথমবারের মতো বৃটেনে মুসলমানের সংখ্যা ৩০ লাখ ছাড়িয়েছে। লন্ডনের কোন কোন অংশে মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের কাছাকাছি মুসলিমদের সংখ্যা।
এই প্রবণতা চলতে থাকলে ওইসব এলাকায় আগামী এক দশকের মধ্যে তারাই হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ। এসব মুসলিমের মধ্যে অর্ধেকের বেশির বয়স ১০ বছরের নিচে। প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডে মুসলিমের সংখ্যা ৩০ লাখের ওপরে।




এর কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়েছে অতিমাত্রায় অভিবাসন ও উচ্চ জন্ম হার। ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিকস াীফসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে অর্ধেকের বেশি জন্ম নিয়েছে বিদেশে। ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে এসব মানুষের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে।




ছাত্রলীগের নেতৃত্ব থেকে শোভন-রাব্বানী বাদ
অবশেষে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব থেকে বাদ পড়লেন রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। তাদের স্থলে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আল নাহিয়ান জয় এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদব লেখক ভট্টাচার্যকে। গতকাল শনিবার রাতে গণভবনে আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটির বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী এ নির্দেশনা দেন।




এক সপ্তাহ ধরে ছাত্রলীগ সভাপতি শোভন ও সাধারণ সম্পাদব রাব্বানীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে। তাদেরকে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে এ গুঞ্জন ব্যাপকভাবে প্রচার হতে থাকে। গতকাল সবার দৃষ্টি ছিল গণভবনের দিকে। চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, টেন্ডারবাজি, দখলদারিত্ব এবং মূল সংগঠনকে সঠিকভাবে পরিচালিত করতে না পারার ব্যর্থতার দায়ে তাদেরকে বহিস্কার করা হয় কিনা সেটাই দেখার জন্য অপেক্ষায় ছিল আওয়ামী লীগসহ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।




এ নিয়ে ছাত্রলীগে দিনভর ছিল উদ্বেগ, উত্তেজনা, উৎকণ্ঠা। মিডিয়াকর্মীরাও ব্যস্ত ছিল নেপথ্যের খবর সংগ্রহে। এর মধ্যেই গতকাল শনিবার দুপুরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ফারজানা ইসলাম সংবাদ সম্মেলন করে ছাত্রলীগের এই দুই শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাদাবির অভিযোগ তুলে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন। এর মধ্যে শোভন ও রাব্বানী দলের শীর্ষনেতাদের ধরে প্রধানমন্ত্রীকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু না, শেষ রক্ষা হয়নি। চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, টেন্ডারবাজি, দখলদারিত্ব এবং মূল সংগঠনকে সঠিকভাবে পরিচালিত করতে না পারার ব্যর্থতার দায়ে তাদেরকে সরিয়ে দেয়া হলো। ছাত্রলীগের রাজনীতিতে এভাবে সরিয়ে দেয়ার ঘটনা নজিরবিহীন।




শনিবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় দুই নেতার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠায় আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সর্বশেষ সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের কমিটি বাতিলের নির্দেশ দেন।




গণভবনে আওয়ামী লীগের বৈঠক শেষে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের জানান, শোভন-রাব্বানীকে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে। তবে ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটি বহাল থাকবে। পদাধিকার বলে আল নাহিয়ান খান জয় ছাত্রলীগের ১ নম্বর ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ায় সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন। আর লেখক ভট্টাচার্য এক নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক থাকায় তিনিই সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়েছেন। তারা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তাদেরকে দ্রæততম সময়ে সম্মেলন করার তাগিদ দেয়া হয়েছে বলেও জানান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।




গত বছরের ১১ ও ১২ মে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন ছাড়াই ছাত্রলীগের দুই দিনব্যাপী ২৯তম জাতীয় সম্মেলন শেষে ৩১ জুলাই রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে সভাপতি এবং গোলাম রাব্বানীকে সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে থাকা সিন্ডিকেট ভেঙে যেহেতু প্রধানমন্ত্রী কমিটি দিয়েছিলেন, তাই তাদের স্বাধীনভাবে কাজের পরিবেশ তৈরি হয়। কারণ শুরু থেকেই ‘নেত্রীর কমিটি’র দুই নেতার বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দরজা সবসময় খোলা ছিল। এর ফলে অতীতের ন্যয় আওয়ামী লীগের জাতীয় বা স্থানীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী কেউ চাইলেই ছাত্রলীগে সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ পাননি। কিন্তু শোভন-রাব্বানী এই ইতিবাচক দিকটির সদ্ব্যবহার না করে এটিকে নেতিবাচক বিষয়ে পরিণত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।




ছাত্রলীগের সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রধানমন্ত্রী কমিটি দেয়ায় শোভন-রাব্বানীর প্রতি আলাদা নজর ছিল আওয়ামী লীগের সব মহলের। তারা ছাত্রলীগকে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর চাওয়া অনুযায়ী ‘নতুন ধারায়’ ফিরিয়ে আনবেন এমন প্রত্যাশা ছিল সংশ্লিষ্টদের একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাÐে জড়িয়েছেন তারা। সংগঠনের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পহেলা বৈশাখের কনসার্টে অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমা চেয়ে মাফ পেলেও এবার আর তা হয়নি। ইতোমধ্যে গণভবনে শোভন-রাব্বানীর প্রবেশের স্থায়ী পাস স্থগিত করা হয়েছে।




এদিকে আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে ধরনা দিয়েও ইতিবাচক কোনো ইঙ্গিত পাচ্ছেন না তারা। ছাত্রলীগের বিষয়ে আওয়ামী লীগের চার দায়িত্বাপ্ত নেতা যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের সঙ্গে কয়েক দফায় সাক্ষাৎ করেন তারা। তবে সেখান থেকে তেমন কোনো আশার বাণী পাননি ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্ব। এর বাইরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বস্থানীয় অন্তত ১০ নেতার কাছে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক গিয়েছেন বলে জানা গেছে। সেখানেও অনেকটা হতাশই হয়েছেন শোভন-রাব্বানী। ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের উদ্দেশে সবার একটাই কথা, ‘প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত! এখানে কারও কিছু করার নেই।’
এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘মমতাময়ী নেত্রী’ সম্বোধন করে একটি চিঠি লেখেন গোলাম রাব্বানী। যেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ‘আপনি বিশ্বাস করে শিক্ষা-শান্তি-প্রগতির যে পবিত্র পতাকা আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন, তার মর্যাদা রক্ষায় সচেষ্ট ছিলাম। দায়িত্ব পালনের শুরু থেকেই চতুর্মুখী চাপ, সদ্য সাবেকদের অসহযোগিতা, নানা ষড়যন্ত্র-প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা আর আমাদের কিছু জ্ঞাত-অজ্ঞাত ভুল ইতিবাচক পরিবর্তনের পথকে কণ্টকাকীর্ণ করেছে। আমাদের দায়িত্বশীল আচরণের ব্যর্থতা ও কিছু ত্রæটি-বিচ্যুতির বাইরেও দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই, প্রিয় নেত্রী দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট তথা বলয় ভেঙে আপনি নিজে পছন্দ করে দায়িত্ব দিয়েছিলেন বলে আমরা একটি বিশেষ মহলের চক্ষুশূল। তারা বিভিন্ন মাধ্যমে মিথ্যা, অপপ্রচার চালিয়ে, প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে উদ্দেশপ্রণোদিতভাবে, সুকৌশলে আপনার এবং আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের কান ভারীর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। নেত্রী, আপনার সন্তানরা এতোটা খারাপ না। আমরা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছি বারবার। অনেক অব্যক্ত কথা রয়েছে যা, আপনাকে কখনো বলার সুযোগ পাইনি। বিভিন্ন মাধ্যমে শ্রæত অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রকৃত সত্যটুকু উপস্থাপনের সুযোগ চাই।’
এরপর চিঠিতে তিনটি ধারাবাহিক অভিযোগের ব্যাখ্যা দেয়া হয়। অভিযোগ-১ উল্লেখ করে বলা হয়, ‘২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউ এর নতুন পার্টি অফিস আপনার আবেগের ঠিকানায় আমাদের ঠাঁই দিয়েছেন। আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলছি, আপনার আমানতকে স্বযতেœ রেখেছি। অফিস অপরিচ্ছন্ন ও নোংরা করা নিয়ে যে অভিযোগ দেয়া হয়েছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। দায়িত্বপ্রাপ্ত শাহজাহান ভাই চায়না ছাত্রলীগ এখানে থাকুক। লোক দিয়ে বাইরে থেকে ময়লা ফেলে বাথরুম ও দেয়াল অপরিচ্ছন্ন করে, সেগুলোর ছবি তুলে আপনাকে দেখানো হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত মিন্টু ভাই, লোকমান ভাই এবং ক্লিনার জাবেদ ভাই এর কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই প্রকৃত সত্য জানতে পারবেন।’
অভিযোগ-২ উল্লেখ করে চিঠিতে ২০ জুলাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মেলনে দেরি করে যাওয়া প্রসঙ্গে বলা হয়। সেখানে রাব্বানী লেখেন, ‘১৮ জুলাই আপনি দেশের বাইরে যাবার আগে অনুমতি নিয়ে ১৯ তারিখ আম্মুর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আমি এবং সভাপতি মাদারীপুর গিয়েছিলাম। এইদিনই সারা রাত নির্ঘুম জার্নি আর বেশ কয়েকটি পথসভা (সর্বশেষ সকাল ৮টায় সাভারে) করে সকাল ৯টায় ফিরি। রেস্ট নিয়ে পূর্বনির্ধারিত ১২টার সম্মেলনে পৌঁছাতে আমাদের ৪০ মিনিট দেরি হয়। যা অনিচ্ছাকৃত এবং অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পূর্বেই অবগত। সকালে ঘুম থেকে দেরিতে উঠার বিষয়টিও অতিরঞ্জিত।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়ে তৃতীয় অভিযোগের ব্যাখ্যা তিনি লেখেন, ‘বিষয়টি ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। উপাচার্য ম্যাম এর স্বামী ও ছেলে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগকে ব্যবহার করে কাজের ডিলিংস করে মোটা অংকের কমিশন বাণিজ্য করেছে। যার প্রেক্ষিতে ঈদুল আজহার পূর্বে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগকে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা দিয়েছে। এ খবর জানাজানি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি শুরু হয় এবং এরই প্রেক্ষিতে উপাচার্য ম্যাম আমাদের স্মরণ করেন। আমরা দেখা করে আমাদের অজ্ঞাতসারে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগকে টাকা দেয়ার প্রশ্ন তোলায় তিনি বিব্রতবোধ করেন। নেত্রী, উক্ত পরিস্থিতিতে আমরা কিছু কথা বলি যা সমীচীন হয়নি। এজন্য আমরা ক্ষমাপ্রার্থী।’
তিনটি অভিযোগের ব্যাখ্যার পর ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক লেখেন, ‘সবকিছুর পরেও আমাদের জ্ঞাত-অজ্ঞাত ভুলগুলোর জন্য অনুতপ্ত ও ক্ষমাপ্রার্থী। আপনি বঙ্গবন্ধু কন্যা, মানবতার মা…। নিজ বদান্যতায় আমাদের ক্ষমা করে ভুলগুলো শুধরে আপনার আস্থার প্রতিদান দেয়ার সুযোগটুকু দিন। আপনি মুখ ফিরিয়ে নিলে যাবার কোনো জায়গা নেই। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে লেখা চিঠিটি শেষ করেন ‘আপনার স্নেহের রাব্বানী’ লিখে।