ভারতীয় সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ভূস্বর্গখ্যাত জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করায় অঞ্চলটিতে ইতোমধ্যে এক থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যা নিয়ে দেশব্যাপী সৃষ্ট উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে এবার উপত্যকাটি পরিদর্শনে গেলেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সংসদীয় দলের প্রতিনিধিরা।




গতকাল মঙ্গলবার (২৯ অক্টোবর) সফরের শুরুতেই কাশ্মীরের পরিস্থিতি নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইইউ প্রতিনিধিরা। তাদের অভিমত, বর্তমানে উপত্যকাটিতে বসবাসরতরা অনেকাংশেই তাদের মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত। অঞ্চলটির পরিদর্শনের মাঝেই ইইউ এমপিরা ভারত সরকারের কাছে এই আবেদনটি জানান।




বিভিন্ন সূত্রের বরাতে গণমাধ্যম ‘এনডিটিভি’ জানায়, বর্তমানে উপত্যকার বাস্তব পরিস্থিতি স্বচক্ষে পরিদর্শনের জন্য মঙ্গলবার অঞ্চলটিতে ভ্রমণ করেন ২৩ সদস্য বিশিষ্ট ইইউ একটি প্রতিনিধি দল। যেখানে তারা কাশ্মীরের বিভিন্ন শ্রেণির লোকজন এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন।




এবার ইইউ প্রতিনিধিরা সাধারণ জনগণের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি বিখ্যাত ডাল লেকেও ভ্রমণ করেন। যেখানে তাদের আগমন উপলক্ষে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া ছিল।পরবর্তীতে দলটির সদস্য হিসেবে সেখানে যাওয়া ইইউর মানবাধিকার সম্পর্কিত হাই কমিশনার রুপের্ট কোলভিলে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন।




যেখানে তিনি বলেছেন, ‘আমরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন, কাশ্মীরে জনগণ দীর্ঘদিন যাবত মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত। আমরা ভারত সরকারের প্রতি আবেদন জানাচ্ছি, তারা যেন অবিলম্বে সেখানকার অবরুদ্ধ পরিস্থিতি প্রত্যাহার করে অঞ্চলটির মানবাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।’




প্রেস বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, ‘জম্মু-কাশ্মীর এবং লাদাখের একাধিক স্থান থেকে মাত্র কয়েকদিন আগেই কারফিউ শিথিল করা হয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত রাজ্যের অধিকাংশ অঞ্চলে আগের পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এমনকি জনগণের অবাধ চলাচলেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে; জনগণের শান্তিপূর্ণ কর্মকান্ডের অধিকারেও হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। কেবল এসব ক্ষেত্রেই নেয় অঞ্চলটির শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং ধর্মের স্বাধীনতার ওপরও সরকারের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। যা কারই কাম্য নয়।




ইইউ সংসদীয় দলের এই প্রতিনিধির ভাষায়, ‘আমাদের কাছে রিপোর্ট এসেছে, এখনো অস্ত্রধারী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো রাজ্যটির স্থানীয় লোকদের ব্যবসা-বাণিজ্য, স্কুলে এমনকি দৈনন্দিন কাজে বাধা প্রয়োগ করছে। সেক্ষেত্রে জঙ্গিদের দাবি না মানায় অনেক লোককেই মারধর করা হয়েছে।’




এ দিকে রাজধানী নয়াদিল্লিতে অবস্থিত ইইউ অ্যামবাসি থেকে এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে একটি বিবৃতি পাঠানো হয়েছে। যেখানে জানানো হয়, এটি কোনো সরকারি সফর নয়। এমপিরা প্রত্যেকেই নিজ উদ্যোগে বেসরকারিভাবে কাশ্মীর সফরে গেছেন।




অপর দিকে ইইউ দূতাবাস থেকে এমন বিবৃতি দেওয়ার পর কাশ্মীরে আগত বিদেশি প্রতিনিধিদের নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, দলটির সাংসদ অধীর রঞ্জন চৌধুরী, বিএসপি নেত্রী মায়াবতীসহ বিরোধী দলের অন্যান্য নেতারা।




একইদিন এক টুইট বার্তায় কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা বলেন, ‘ইইউ সংসদীয় প্রতিনিধি দলের সদস্যরা সেখানে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে গেল; অথচ ভারতীয় সংসদ সদস্যদের শ্রীনগর বিমানবন্দরে আটকে রাখা হয়। এটা সত্যিই অদ্ভুত জাতীয়তাবাদ।প্রিয়াঙ্কা বলেন, ‘ইইউ প্রতিনিধিরা কাশ্মীরে বেসরকারিভাবে ভ্রমণ করতে গেছেন। যার অর্থ তারা বিষয়টি নিয়ে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেবেন না। যা আমাদের কাম্য নয়।’

এসবের মধ্যেই চলমান কাশ্মীর ইস্যুতে পাক-ভারত মধ্যকার সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এরই মধ্যে একে একে ভারত সরকারের সঙ্গে বাণিজ্য, যোগাযোগসহ সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দিয়েছে প্রতিবেশী পাকিস্তান। যদিও এমন সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে ভারত পাশে পেয়েছে রাশিয়াকে এবং পাক সরকারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশ ইরান ও এশিয়ার পরাশক্তি চীন।
এর আগে গত ৫ আগস্ট ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করেছিল ক্ষমতাসীন মোদী সরকার। যার প্রেক্ষিতে পরবর্তীকালে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে বিতর্কিত লাদাখ ও জম্মু-কাশ্মীর সৃষ্টির প্রস্তাবেও সমর্থন জানানো হয়।