আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সদ্য অপসারিত প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বলেছেন, ‘আমার বি’রুদ্ধে অসদা’চরণের অ’ভিযোগ আনা হয়েছে।অথচ আমাকে আত্মপক্ষ সমর্থনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। আমি যদি মুখ খুলি তাহলে ট্রাই’ব্যুনালের অনেক কিছুই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আমি প্রধানমন্ত্রী বরাবরে সব কিছুই জানাব।’




অপসারণ নিয়ে আজ সোমবার সন্ধ্যায় মুঠোফোনে এনটিভি অনলাইনকে এ কথা বলেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ।তুরিন আফরোজ বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে বলা হয়, আমি বোরকা পরে আসামির সাথে দেখা করেছি। আমি যদি দেখা করিও তাহলে দেশে কি বোরকা পরা নিষিদ্ধ?আমার মাধ্যমে আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁর দণ্ডও হয়। আমি নাকি ২৫ কোটি টাকা নিয়েছি। এসব টাকা নিলে তাহলে আমি যদি অভি’যুক্তও হই।




তাহলে তো আমাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। আমি যদি মুখ খুলি তাহলে তো ট্রাইব্যুনালের অনেক কিছুই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আমি এসব বলব না। তবে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে সব কিছুই জানাব।এদিকে অপসারণের খবর শোনার পর তুরিন অফরোজ তাঁর ফেসবুক পেজে লিখেন, ‘জীবনের অনেক সত্য অপ্রকাশিত থেকে যায়। আমি ট্রাইব্যু’নালের প্রসিকিউটর হিসেবে থাকি বা না থাকি, আপোষহীনভাবে একাত্তরের যু’দ্ধা’পরাধের বিচার চাই।




এই বিচারের দাবীতে অনেক আন্দোলন আমি করেছি, রাস্তায় মার পর্যন্ত খেয়েছি। আমার এবং আমার মেয়ের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছি। তবে আপনাদের ভালবাসা পেয়েছি, দোয়া, শ্রদ্ধা ও সম্মান পেয়েছি।আপনাদের সকলের কাছে আমার ও আমার মেয়ের কৃতজ্ঞতা রইল। শুধু জানবেন, আমি শত ভাগ সততা দিয়ে প্রসিকিউটর হিসেবে আমার দায়ীত্ব পালন করেছি। জয় বাংলা! জয় বঙ্গবন্ধু!’




শৃঙ্খলা ও পেশাগত আচরণ ভঙ্গ এবং গুরুতর অসদাচরণের দায়ে ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজকে আজ সোমবার আন্তর্জাতিক অ’পরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর পদ থেকে অপসারণ করা হয়। আইন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ বিষয়টি জানানো হয়।আইন মন্ত্রণালয়ের উপসলিসিটর এস এম নাহিদা নাজনীন স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘শৃঙ্খলা ও পেশাগত আচরণ ভঙ্গ এবং গুরুতর অসদাচরণের দায়ে ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজকে ট্রাই’ব্যুনালের প্রসিকিউটর পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে।




২০১৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজকে আন্তর্জাতিক অপরা’ধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু শৃ’ঙ্খলা ও পেশাগত আচরণ ভঙ্গ এবং গুরুতর অসদাচরণের দায়ে ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজকে ট্রা’ইব্যুনালের প্রসিকিউটর পদ থেকে অপ’সারণ করা হলো।’




আগে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপ’রাধ মামলার আসামি জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) সাবেক মহাপরিচালক ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে গোপনে স্প’র্শকাতর তথ্য সরবরাহ করার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।২০১৮ সালের মে মাসে এ ঘটনার জেরে ট্রাইব্যুনালের সব ধরনের মা’মলা থেকে তুরিন আফরোজকে অব্যাহতি দেন প্রসিকিউশন। একই সঙ্গে প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করা হয়। তদন্তে তুরিন আফরোজের বিরু’দ্ধে ওঠা সব অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় পদ থেকে অপসারণ করা হয়।




২০১৮ সালে অভিযোগ ওঠার পর ট্রাইব্যু’নালের প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘ড. তুরিনের বি’রুদ্ধে অ’ভিযোগ, এক আসামির কাছে মামলার স্প’র্শকাতর কিছু তথ্য সরবরাহ করেছেন তিনি।একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়ে’ন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) মুহাম্মদ ওয়াহিদুল হককে গত ২৪ এপ্রিল গ্রেপ্তার করা হয়। পরের দিন ট্রাই’ব্যুনাল তাঁকে কারাগারে পাঠান। ওয়াহিদুল হকের বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তার নাম মতিউর রহমান।




ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১১ নভেম্বর ওয়াহিদুল হকের বিরুদ্ধে করা মাম’লাটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রসিকিউটর তুরিন আফ’রোজকে। এর এক সপ্তাহ পর তিনি ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে সাক্ষাৎ করতে চান। তাঁকে যেকোনো দিন আটক করা হতে পারে বলেও তিনি কথোপকথনের সময় জানান।




প্রথমে নির্ধারণ হয় ১৯ নভেম্বর সন্ধ্যায় মুহাম্মদ ওয়াহিদুল হকের গুলশানের বাসায় তাঁদের সাক্ষাৎ হবে। এ সময় ড. তুরিন আফরোজ জানান, সহকারী ফারাবী বিন জহির অনিন্দ্যকে নিয়ে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে বোরকা পরে তাঁরা দুজন ওয়াহিদুল হকের বাসায় যাবেন।

পরবর্তী সময়ে সাক্ষাতের স্থান পরিবর্তন হয়। তাঁরা গুলশানে অলিভ গার্ডেন নামের একটি রেস্তোরাঁয় সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তাঁরা প্রায় তিন ঘণ্টা মামলার নথিপত্র নিয়ে আলোচনা করেন। তখন মুহাম্মদ ওয়াহিদুল হককে তুরিন আফরোজের সহকারী ফারাবী বলেন, ‘আপনি যে পদে ছিলেন, তাতে তো ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা এমনিতেই ক্যাশ থাকার কথা।’ এ সময় ওয়াহিদুল হকের বি’রুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং তাঁকে গ্রেপ্তারের আদেশের অনুলিপি নিয়েও আলোচনা হয় বলে জানা গেছে।

ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা জানায়, ওয়াহিদুল হক মুক্তি’যু’দ্ধে’র সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্য ছিলেন। ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফিরে দুবছর পর পুলিশে যোগ দেন।নব্বইয়ের দশকে তিনি জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্ব পান। এরপর গত শতকের শেষ দিকে পাসপোর্ট অধিদ’প্তরের মহাপরিচা’লক হন।

১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ রংপুর ক্যান্টনমেন্টে ৫০০ থেকে ৬০০ নিরস্ত্র বাঙালি ও সাঁওতালের ওপর মেশি’নগান দিয়ে গু’লি চালিয়ে হ’ত্যা ছাড়াও মানব’তাবিরোধী নানা অপ’রাধের সঙ্গে ওয়াহিদুল হকের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার পরই তাঁকে গ্রেপ্তা’র করা হয় বলে জানায় সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থা।আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সরকারের পক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য প্রসিকিউটর হিসেবে ব্যারিস্টার ড. তুরিন আফরোজকে ২০১৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি নিয়োগ দেয় সরকার।পরে জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী ও বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ শীর্ষ যু’দ্ধাপরাধীদের বিরু’দ্ধে মামলা পরিচালনা করেন তুরিন আফরোজ।

উৎসঃ এনটিভি